স্বামী-স্ত্রী সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সহবাস করা কি জায়েজ? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত

স্বামী-স্ত্রী একান্ত নির্জনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সহবাস করা কি জায়েজ? এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন, সহিহ হাদিস ও ইসলামী ফকীহদের সঠিক বিধান জানুন।
স্বামী-স্ত্রী সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সহবাস করা কি জায়েজ? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত

স্বামী-স্ত্রী সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সহবাস করা কি জায়েজ? কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানজনক। এটি কেবল একটি সামাজিক বন্ধনই নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং ইবাদতের একটি অনন্য মাধ্যম। দাম্পত্য জীবনে একে অপরের অধিকার রক্ষা ও লজ্জাশীলতার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।

তবে অনেক দম্পতির মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে— একান্ত নির্জনে স্বামী ও স্ত্রী কি সম্পূর্ণ বিবস্ত্র বা উলঙ্গ হয়ে সহবাস করতে পারবেন? এটি কি ইসলামী শরিয়তসম্মত? চলুন, এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন, সহিহ হাদিস এবং প্রখ্যাত ইসলামী ফকীহদের মতামত বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

কুরআনের দিকনির্দেশনা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দর একটি উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন:

"তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭)

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হালাল বা বৈধ। পোশাক যেমন মানুষের শরীরকে ঢেকে রাখে এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের জন্য ঠিক তেমনই। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও উপভোগ শরিয়তসম্মত, তবে তা অবশ্যই একান্ত গোপনীয়তার মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা আরও এরশাদ করেন:

"তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা যেভাবে ইচ্ছা (শরিয়তসম্মতভাবে) তোমাদের শস্যক্ষেতে গমন কর।"
— (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২৩)

এই আয়াতটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দাম্পত্য মিলনের বৈধতা ও স্বাধীনতাকে সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে।

হাদিসের আলোকে শরিয়তের বিধান

হাদিস শরীফে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বাহয ইবনু হাকীম (রহ.) তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

"তোমার লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করো, তবে তোমার স্ত্রী অথবা তোমার মালিকানাধীন দাসী ব্যতীত।"
— (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪০১৭; জামে তিরমিযী, হাদিস: ২৭৬৯)

এই সহিহ হাদিসটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে, স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের লজ্জাস্থান দেখা বা একে অপরের সামনে বিবস্ত্র হওয়া সম্পূর্ণ বৈধ।

ফকীহ ও ইসলামী স্কলারদের অভিমত

চার মাজহাবের প্রখ্যাত ফকীহগণ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের সম্পূর্ণ শরীর দেখতে পারবেন। সুতরাং, একান্ত নির্জনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে মেলামেশা করা ইসলামে জায়েজ।

তবে উত্তম আদব ও শালীনতার খাতিরে মেলামেশার সময় শরীরের ওপর একটি হালকা কাপড় রাখা বা চাদর টেনে দেওয়াকে অনেক আলেম মুস্তাহাব (উত্তম) বলেছেন। তবে এটি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব বিধান নয়। প্রখ্যাত ফকীহদের কয়েকটি মতামত নিচে দেওয়া হলো:

  • ইমাম ইবনু কুদামাহ (রহ.): "স্বামী তার স্ত্রীর সমস্ত শরীর দেখতে পারে এবং স্ত্রীও তার স্বামীর সমস্ত শরীর দেখতে পারে।" (আল-মুগনী, ৭/৩০)
  • ইমাম নববী (রহ.): "স্বামী-স্ত্রীর জন্য পরস্পরের সমস্ত শরীর দেখা সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ।" (আল-মাজমূ', ২/১৮৯)

একটি দুর্বল হাদিস সম্পর্কে সতর্কতা

আমাদের সমাজে অনেক সময় একটি প্রচলিত কথা শোনা যায় যে, "সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সহবাস করো না, নতুবা গাধার মতো হয়ে যাবে।"

মুহাদ্দিসগণ ও ইসলামী স্কলাররা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই বর্ণনাটি সহিহ নয়; এটি একটি দুর্বল (যঈফ) বা ভিত্তিহীন কথা। ইসলামী শরিয়তে এমন দুর্বল বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে কোনো বিধান বা ফতোয়া প্রমাণ করা যায় না। তাই এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত থাকা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

উপসংহার

সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি প্রমাণিত যে, সহিহ কুরআন ও হাদিসের আলোকে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত নির্জনে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সহবাস করা শরিয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে ইসলামী আদব, শালীনতা এবং সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখা একজন মুমিনের জন্য সর্বদা উত্তম। দাম্পত্য সম্পর্ক হোক পবিত্রতা, ভালোবাসা ও ইসলামী মূল্যবোধের এক অপরূপ মেলবন্ধন।

About the author

Author

Masum Billah

আসসালামু আলাইকুম! আমি মাসুম বিল্লাহ, 'Priyo Topic' ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও কন্টেন্ট রাইটার। প্রযুক্তি, ইন্টারনেট নারপত্তা এবং দৈনন্দিন জীবনের দরকারী নানা তথ্য সহজ ভাষায় আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার মূল লক্ষ্য। নিত্যনতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে সাথেই থাকুন!

Post a Comment

কমেন্ট করতে Enter Comment ক্লিক করুন

Join the conversation