![]() |
| জন্মনিবন্ধন থেকে এনআইডি—সব সেবায় এবার একটাই কার্ড ‘এক-আইডি’ One-ID |
জন্মনিবন্ধন থেকে এনআইডি—সব সেবায় এবার একটাই কার্ড ‘এক-আইডি’ (One-ID)
বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কাজের জন্য একাধিক পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হয়। কখনো জন্মনিবন্ধন, কখনো জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), আবার কখনো পাসপোর্ট বা টিআইএন (TIN) নম্বর। এই বহুমুখী পরিচয়পত্রের ঝামেলা দূর করে নাগরিকদের জীবনকে আরও সহজ করতে বাংলাদেশ সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
জন্মের পরপরই প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি মাত্র স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয়পত্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক-আইডি’ (One-ID) বা ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’।
‘এক-আইডি’ বা ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি আসলে কী?
বর্তমানে আমাদের দেশে জন্মের পর দেওয়া হয় জন্মনিবন্ধন সনদ এবং ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হলে দেওয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত ‘এক-আইডি’ ব্যবস্থায় কোনো বয়সসীমা থাকবে না। জন্মের পরপরই একজন নাগরিককে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচিতি নম্বর বা কার্ড দেওয়া হবে, যা তার আজীবন স্থায়ী পরিচয় হিসেবে গণ্য হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে যেকোনো সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই একটিমাত্র কার্ডই যথেষ্ট হবে।
কী কী সুবিধা থাকছে এই ‘এক-আইডি’ তে?
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের মতে, এই সিস্টেমটি চালু হলে নাগরিকদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে যাবে। এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
- বারবার তথ্য দেওয়ার ঝামেলা মুক্তি: সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গেলে বারবার নিজের তথ্য বা কাগজপত্রের কপি জমা দিতে হবে না।
- সব সেবা এক ছাতার নিচে: পর্যায়ক্রমে জাতীয় পরিচয়পত্র, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো বিদ্যমান সব কার্ডের সেবাকে এই ‘এক-আইডি’র সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
- ডিজিটাল ওয়ালেট সুবিধা: তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা এই উদ্যোগকে “একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, এই কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধাও পাওয়া যেতে পারে।
- আন্তসংযোগ বৃদ্ধি: পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বরের (TIN) তথ্যভান্ডারের মধ্যে আন্তসংযোগ তৈরি হবে, ফলে সেবা প্রদান প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও কার্যকর।
প্রকল্পের নাম ও বাস্তবায়নের সময়কাল
এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডি-স্টার’ (D-STAR: Digital Service Transformation for Access and Resilience) নামক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC)।
- সময়কাল: ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
- বর্তমান অবস্থা: অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি এরইমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বাজেট ও কার্ড উৎপাদনের খরচ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী দেশের ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য এই কার্ড তৈরির পরিকল্পনা করা হলেও, ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করে ২০ কোটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
- প্রতিটি কার্ডের খরচ: প্রতিটি কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় হবে প্রায় ২৪৬ টাকা (২ ডলার) এবং বিতরণে ব্যয় হবে ১২৩ টাকা (১ ডলার)। অর্থাৎ নাগরিকদের হাতে একটি কার্ড পৌঁছাতে মোট খরচ হবে প্রায় ৩৬৯ টাকা।
- মোট বাজেট: ‘ডি-স্টার’ প্রকল্পটির জন্য মোট ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংক ঋণ হিসেবে দেবে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।
শেষ কথা
‘এক-আইডি’ ব্যবস্থা বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। একাধিক কার্ড বহনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেয়ে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তাদের কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবাগুলো উপভোগ করতে পারবেন। এখন শুধু অপেক্ষা প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেয়ে বাস্তবায়নের মুখ দেখার।
