![]() |
| জন্ডিস কি? জন্ডিসের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও সঠিক চিকিৎসা |
জন্ডিস (Jaundice): কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও সঠিক চিকিৎসা
জন্ডিস (Jaundice) শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। আমাদের সমাজে জন্ডিস নিয়ে নানা ধরনের ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার এবং ভুল চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে। অনেকেই জন্ডিসকে একটি স্বতন্ত্র রোগ বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরের কোনো জটিলতা বা অন্য কোনো রোগের একটি বাহ্যিক লক্ষণ মাত্র।
যখন মানবদেহের রক্তে 'বিলিরুবিন' (Bilirubin) নামক এক প্রকার হলদেটে রঞ্জক পদার্থের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়, তখন ত্বক, চোখের সাদা অংশ (Sclera) এবং শরীরের বিভিন্ন মিউকাস মেমব্রেন হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এই দৃশ্যমান অবস্থাকেই জন্ডিস বলা হয়। একটি স্বাস্থ্যকর এবং এসইও-বান্ধব ওয়েবসাইটের জন্য জন্ডিস সম্পর্কে ধাপে ধাপে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
মানবদেহের লিভার বা যকৃৎ: এক বিস্ময়কর অঙ্গ
জন্ডিসের মূল কারণ বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের লিভার বা যকৃৎ সম্পর্কে জানতে হবে। লিভার মানবদেহের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ অঙ্গ এবং এটি শরীরের 'কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি' বা রাসায়নিক কারখানা হিসেবে পরিচিত। পেটের ডান দিকের উপরিভাগে অবস্থিত এই অঙ্গটি ৫০০-এর বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রক্ত থেকে ক্ষতিকর পদার্থ ছেঁকে বের করা, পিত্তরস (Bile) তৈরি করা, শর্করা ও চর্বি বিপাক করা এবং বিলিরুবিন নিয়ন্ত্রণ করা। লিভারের এই স্বাভাবিক কার্যক্রমে যখন কোনো ব্যাঘাত ঘটে, তখনই জন্ডিসের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়।
বিলিরুবিন কী এবং কীভাবে তৈরি হয়?
জন্ডিসের পেছনের মূল খলনায়ক বা উপাদান হলো এই 'বিলিরুবিন'। আমাদের রক্তের লোহিত রক্তকণিকাগুলোর (Red Blood Cells) একটি নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল রয়েছে, যা সাধারণত ১২০ দিন। এই ১২০ দিন পর পুরনো এবং দুর্বল লোহিত রক্তকণিকাগুলো প্লীহা (Spleen) এবং লিভারে এসে ভেঙে যায়।
লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার পর এর ভেতরের হিমোগ্লোবিন থেকে 'হিম' (Heme) এবং 'গ্লোবিন' (Globin) আলাদা হয়ে যায়। এই 'হিম' অংশটি পরবর্তীতে কয়েকটি রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে 'আনকনজুগেটেড বিলিরুবিন' (Unconjugated Bilirubin)-এ পরিণত হয়। এটি পানিতে অদ্রবণীয় এবং বিষাক্ত।
এরপর এই আনকনজুগেটেড বিলিরুবিন রক্তের মাধ্যমে লিভারে পৌঁছায়। লিভার এটিকে প্রক্রিয়াজাত করে 'কনজুগেটেড বিলিরুবিন' (Conjugated Bilirubin)-এ রূপান্তরিত করে, যা পানিতে দ্রবণীয়। এই প্রক্রিয়াজাত বিলিরুবিন পিত্তরসের সাথে মিশে পিত্তনালি দিয়ে অন্ত্রে প্রবেশ করে এবং পরিপাকে সাহায্য করে। পরিশেষে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এটি ইউরোবিলিনোজেন এবং স্টারকোবিলিন-এ পরিণত হয়ে যথাক্রমে প্রস্রাব ও মলের মাধ্যমে শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়। মলের স্বাভাবিক বাদামি রঙের জন্য এই স্টারকোবিলিনই দায়ী।
রক্তে বিলিরুবিনের স্বাভাবিক মাত্রা:
- স্বাভাবিক মাত্রা: ০.২ থেকে ১.২ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার (mg/dL)।
- জন্ডিসের লক্ষণ প্রকাশের মাত্রা: রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা ২.৫ বা ৩ mg/dL-এর উপরে চলে গেলে তখন বাইরে থেকে ত্বক বা চোখ হলুদ দেখা যায়।
জন্ডিসের বৈজ্ঞানিক প্রকারভেদ
রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা কেন বাড়ছে এবং এই বৃদ্ধির উৎস শরীরের কোথায়, তার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জন্ডিসকে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা হয়।
-
প্রি-হেপাটিক বা হেমোলাইটিক জন্ডিস (Pre-hepatic or Hemolytic Jaundice):
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এই জন্ডিসের উৎপত্তি লিভারে পৌঁছানোর আগে। যখন কোনো কারণে শরীরের লোহিত রক্তকণিকাগুলো স্বাভাবিক সময়ের (১২০ দিন) অনেক আগেই মাত্রাতিরিক্ত হারে ভেঙে যেতে শুরু করে, তখন বিপুল পরিমাণ আনকনজুগেটেড বিলিরুবিন তৈরি হয়। লিভারের একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা আছে। অতিরিক্ত বিলিরুবিন লিভার একবারে প্রক্রিয়াজাত করে শরীর থেকে বের করতে পারে না। ফলে রক্তে আনকনজুগেটেড বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে এই জন্ডিস সৃষ্টি হয়।
প্রধান কারণসমূহ: ম্যালেরিয়া পরজীবীর আক্রমণ, থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia), সিকেল সেল অ্যানিমিয়া (Sickle Cell Anemia), অটোইমিউন হেমোলাইটিক অ্যানিমিয়া, এবং ভুল গ্রুপের রক্ত শরীরে প্রবেশ করানো। -
হেপাটিক বা হেপাটোসেলুলার জন্ডিস (Hepatic or Hepatocellular Jaundice):
এটি সরাসরি লিভারের কোষগুলোর (Hepatocytes) অসুস্থতা বা ক্ষতির কারণে হয়ে থাকে। যখন লিভার নিজে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, অতিরিক্ত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসে, তখন লিভার কোষগুলো রক্ত থেকে আনকনজুগেটেড বিলিরুবিন গ্রহণ করতে এবং তা প্রক্রিয়াজাত করে পিত্তনালিতে পাঠাতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই ধরনের জন্ডিসের হার সবচেয়ে বেশি।
প্রধান কারণসমূহ: ভাইরাল হেপাটাইটিস (হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ই), লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis), অতিরিক্ত মদ্যপানজনিত লিভারের ক্ষতি (Alcoholic Hepatitis), এবং লিভার ক্যানসার। কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন- দীর্ঘমেয়াদে প্যারাসিটামল বা যক্ষ্মার ওষুধ আইসোনিয়াজিড সেবন) লিভারের কোষ নষ্ট করে এই জন্ডিস ঘটাতে পারে। -
পোস্ট-হেপাটিক বা অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিস (Post-hepatic or Obstructive Jaundice):
এই জন্ডিসকে অনেক সময় 'সার্জিক্যাল জন্ডিস'ও বলা হয়। এক্ষেত্রে লিভার তার কাজ ঠিকমতোই করে। লিভার বিলিরুবিনকে কনজুগেটেড ফর্মে রূপান্তর করে পিত্তরসের সাথে মিশিয়ে দেয়। কিন্তু লিভার থেকে সেই পিত্তরস অন্ত্রে যাওয়ার পথে (পিত্তনালিতে) যদি কোনো বাধা বা ব্লক থাকে, তবে পিত্তরস আর নিচে নামতে পারে বায় না। ফলে এটি উল্টো পথে লিভারে ফিরে আসে এবং সেখান থেকে রক্তে মিশে যায়।
প্রধান কারণসমূহ: পিত্তথলিতে পাথর (Gallstones) তৈরি হয়ে তা পিত্তনালিতে আটকে যাওয়া, পিত্তনালির টিউমার, অগ্ন্যাশয়ের মাথার অংশে ক্যানসার (Pancreatic Cancer), অথবা পিত্তনালির কোনো জন্মগত ত্রুটি। এক্ষেত্রে রোগীর মলের রং সাদাটে বা ছাই রঙের হয়ে যায় কারণ বিলিরুবিন অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না।
জন্ডিস কেন হয়? (Detailed Causes of Jaundice)
জন্ডিস সৃষ্টির পেছনে অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই কারণগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। নিচে সবচেয়ে সাধারণ এবং মারাত্মক কারণগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
-
১. ভাইরাল হেপাটাইটিস (Viral Hepatitis) - জন্ডিসের প্রধান শত্রু:
বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে জন্ডিসের সবচেয়ে বড় কারণ হলো লিভারে ভাইরাসের সংক্রমণ, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'ভাইরাল হেপাটাইটিস' বলা হয়। প্রধানত পাঁচ ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস লিভারকে আক্রমণ করে:- হেপাটাইটিস 'এ' (Hepatitis A): এটি মূলত দূষিত পানি এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। রাস্তার পাশের খোলা খাবার, দূষিত পানির শরবত বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার খেলে এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে। সাধারণত শিশুদের মধ্যে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এটি সাধারণত কয়েক সপ্তাহের বিশ্রামে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।
- হেপাটাইটিস 'বি' (Hepatitis B): এটি অত্যন্ত মারাত্মক একটি ভাইরাস যা রক্ত, অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক এবং আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে নবজাতকের শরীরে ছড়ায়। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অনেকের ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক রূপ নেয়, যা থেকে পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসার হতে পারে।
- হেপাটাইটিস 'সি' (Hepatitis C): এই ভাইরাসটিকে অনেক সময় 'নীরব ঘাতক' বলা হয়। কারণ, আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘকাল এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এটিও মূলত দূষিত রক্ত সঞ্চালন, ব্যবহৃত সুচ বা সিরিঞ্জ এবং অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস সি-এর কারণে লিভার ধীরে ধীরে তার কার্যক্ষমতা হারায়।
- হেপাটাইটিস 'ই' (Hepatitis E): হেপাটাইটিস 'এ' এর মতো এটিও দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণ মানুষের জন্য এটি খুব একটা মারাত্মক না হলেও, গর্ভবতী মায়েদের জন্য হেপাটাইটিস 'ই' অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মা ও শিশু উভয়েরই মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।
-
২. লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis):
লিভার সিরোসিস হলো লিভারের একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং মারাত্মক রোগ। দীর্ঘকাল ধরে হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসের সংক্রমণ, অতিরিক্ত মদ্যপান অথবা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার (ফ্যাটি লিভার) কারণে লিভারের সুস্থ কোষগুলো মরে যায় এবং সেখানে শক্ত ফাইব্রাস টিস্যু তৈরি হয়। এর ফলে লিভার সংকুচিত হয়ে যায় এবং রক্ত থেকে বিলিরুবিন ছেঁকে বের করার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে হারিয়ে ফেলে। সিরোসিসের শেষ পর্যায়ে রোগীদের মারাত্মক জন্ডিস দেখা দেয়। -
৩. অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ (অতিরিক্ত মদ্যপান):
যারা নিয়মিত এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল বা মদ পান করেন, তাদের লিভার মারাত্মক বিষক্রিয়ার শিকার হয়। লিভার অ্যালকোহলকে ভাঙতে গিয়ে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে একে 'অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার' বলা হয়, যা পরবর্তীতে 'অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস' এবং সবশেষে সিরোসিসে রূপ নেয়। এই অবস্থায় জন্ডিস একটি সাধারণ উপসর্গ। -
৪. পিত্তথলি ও পিত্তনালির সমস্যা (Gallstones & Biliary Issues):
লিভারে তৈরি হওয়া পিত্তরস পিত্তথলিতে (Gallbladder) জমা থাকে এবং পরিপাকের সময় পিত্তনালি দিয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে। অনেক সময় পিত্তথলিতে কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিন জমে ছোট ছোট পাথর তৈরি হয়। এই পাথরগুলো যদি পিত্তনালিতে এসে আটকে যায়, তবে পিত্তরসের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পিত্তরস লিভারে ফিরে গিয়ে রক্তে মিশে জন্ডিস সৃষ্টি করে। এছাড়াও পিত্তনালিতে টিউমার বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কারণেও এই পথ বন্ধ হয়ে জন্ডিস হতে পারে। -
৫. ওষুধের ক্ষতিকর প্রভাব (Drug-induced Jaundice):
কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে (Hepatotoxic drugs)। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় প্যারাসিটামল (Paracetamol) সেবন করলে লিভার ফেইলিওর হতে পারে, যার প্রথম লক্ষণ জন্ডিস। এছাড়া যক্ষ্মার ওষুধ (যেমন- Isoniazid, Rifampin), কিছু অ্যান্টিবায়োটিক এবং স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ফলেও জন্ডিস হতে পারে। -
৬. নবজাতকের জন্ডিস (Neonatal Jaundice):
জন্মের প্রথম সপ্তাহে অনেক শিশুর ত্বক হলুদ হয়ে যায়। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর রক্তে অনেক বেশি লোহিত রক্তকণিকা থাকে। জন্মের পর শিশু যখন নিজে শ্বাস নিতে শুরু করে, তখন এই অতিরিক্ত কণিকাগুলো দ্রুত ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু নবজাতকের লিভার তখনো পুরোপুরি পরিপক্ক থাকে না বলে এই বিপুল পরিমাণ বিলিরুবিন শরীর থেকে বের করতে পারে না। একে 'ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস' বলা হয়, যা সাধারণত ক্ষতিকর নয় এবং কিছুদিন পর নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে বিলিরুবিনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি (Kernicterus) করতে পারে।
জন্ডিসের লক্ষণসমূহ: শরীর কী সংকেত দেয়? (Symptoms of Jaundice)
জন্ডিস মূলত নিজেই একটি লক্ষণ। তবে জন্ডিস দেখা দেওয়ার আগে ও পরে শরীরে আরও বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে। জন্ডিসের পেছনের কারণ অনুযায়ী লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। নিচে জন্ডিসের প্রধান ও দৃশ্যমান লক্ষণগুলো আলোচনা করা হলো:
- চোখ ও ত্বক হলুদ হওয়া: এটি জন্ডিসের সবচেয়ে প্রধান এবং দৃশ্যমান লক্ষণ। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা ২.৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার অতিক্রম করলে প্রথমেই চোখের সাদা অংশ (Sclera) হলুদ হতে শুরু করে। এরপর জিহ্বার নিচের অংশ হলুদ হয়। বিলিরুবিনের মাত্রা আরও বাড়তে থাকলে মুখমণ্ডলসহ পুরো শরীরের ত্বক তীব্র হলুদ বর্ণ ধারণ করে। অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিসের ক্ষেত্রে ত্বকের রঙ কালচে হলুদ বা সবুজাভ হলুদও হতে পারে।
- প্রস্রাব ও মলের রঙের পরিবর্তন:
- গাঢ় প্রস্রাব: রক্তে যখন কনজুগেটেড বিলিরুবিনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়, তখন কিডনি সেই অতিরিক্ত বিলিরুবিন প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ, সরিষার তেল বা কড়া চায়ের লিকারের মতো হয়ে যায়।
- ফ্যাকাশে বা সাদাটে মল: স্বাভাবিক মলের বাদামি রঙের জন্য বিলিরুবিন (স্টারকোবিলিন) দায়ী। কিন্তু পিত্তনালিতে ব্লক থাকার কারণে (অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিস) বিলিরুবিন অন্ত্রে পৌঁছাতে না পারলে মলের রং ছাই রঙের বা সাদাটে মাটির মতো ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
- পেটে ব্যথা ও অস্বস্তি: লিভার যেহেতু পেটের ডান দিকের উপরিভাগে (Right upper quadrant) থাকে, তাই লিভারে প্রদাহ বা হেপাটাইটিস হলে লিভার ফুলে যায় এবং ওই অংশে ভারী ভাব বা হালকা থেকে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে। পিত্তনালিতে পাথর আটকে জন্ডিস হলে এই ব্যথা অনেক তীব্র হয় এবং তা ডান কাঁধের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব ও ওজন হ্রাস: জন্ডিসের রোগীদের খাবারে প্রচণ্ড অরুচি দেখা দেয়। খাবার দেখলেই বা খাবারের গন্ধ পেলেই বমি বমি ভাব (Nausea) হয় অথবা বমি হয়ে যায়। লিভার ঠিকমতো কাজ না করায় হজম প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। দীর্ঘদিনের জন্ডিসে রোগীর ওজন দ্রুত কমে যেতে পারে।
- অত্যধিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা: শরীর সবসময় ম্যাজম্যাজ করে। সামান্য কাজ করলেই রোগী প্রচণ্ড হাঁপিয়ে ওঠেন এবং অতিরিক্ত দুর্বল অনুভব করেন। লিভারের গ্লুকোজ বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কারণে শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়।
- তীব্র চুলকানি: বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিস (পিত্তনালিতে পাথর বা ব্লকের কারণে) হলে পিত্ত লবণ (Bile salts) রক্তে মিশে যায় এবং ত্বকের নিচে জমা হতে শুরু করে। এর ফলে সারা শরীরে তীব্র চুলকানি দেখা দেয়, যা রাতের বেলায় আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় চুলকাতে চুলকাতে ত্বকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
- জ্বর ও কাঁপুনি: ভাইরাল হেপাটাইটিসের প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্লু-এর মতো লক্ষণ দেখা দেয়। কাঁপুনি দিয়ে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার জ্বর আসতে পারে। এর পাশাপাশি পেশিতে এবং অস্থিসন্ধিতে (Joints) ব্যথা হতে পারে। পিত্তনালিতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ (Cholangitis) হলেও তীব্র জ্বর আসে।
জন্ডিস রোগ নির্ণয় (Diagnosis of Jaundice)
কারও শরীরে জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসক প্রথমেই এর মূল কারণ এবং মাত্রা জানার জন্য কিছু প্যাথলজিক্যাল ও ইমেজিং পরীক্ষার পরামর্শ দেন। সঠিক কারণ নির্ণয় না করে চিকিৎসা শুরু করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। নিচে প্রধান পরীক্ষাগুলো আলোচনা করা হলো:
- ১. সিরাম বিলিরুবিন টেস্ট (Serum Bilirubin Test): এটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। এই টেস্টের মাধ্যমে রক্তে মোট বিলিরুবিনের (Total Bilirubin) মাত্রা কত, তার সাথে ডাইরেক্ট (কনজুগেটেড) ও ইনডাইরেক্ট (আনকনজুগেটেড) বিলিরুবিনের পরিমাণ আলাদাভাবে জানা যায়। এটি চিকিৎসকদের বুঝতে সাহায্য করে যে সমস্যাটি লিভারের ভেতরে, নাকি লিভারের বাইরে বা রক্তে।
- ২. লিভার ফাংশন টেস্ট (Liver Function Test - LFT): লিভারের স্বাস্থ্য এবং কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো এলএফটি (LFT)। এর মধ্যে রয়েছে:
- SGPT (ALT) এবং SGOT (AST): এই এনজাইমগুলোর মাত্রা বেড়ে যাওয়া মানে লিভারের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হচ্ছে।
- Alkaline Phosphatase (ALP): এই এনজাইমের মাত্রা সাধারণত পিত্তনালিতে কোনো বাধা বা অবস্ট্রাকশন থাকলে বৃদ্ধি পায়।
- অ্যালবুমিন ও প্রোটিন: লিভার ঠিকমতো প্রোটিন তৈরি করতে পারছে কিনা তা যাচাই করা হয়।
- ৩. ভাইরাল হেপাটাইটিস মার্কার (Viral Markers): জন্ডিসের কারণ ভাইরাস কিনা তা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু রক্ত পরীক্ষা করা হয় (যেমন- হেপাটাইটিস 'এ' এর জন্য: Anti-HAV, হেপাটাইটিস 'বি' এর জন্য: HBsAg ইত্যাদি)।
- ৪. পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG of Whole Abdomen): লিভারের আকার, পিত্তথলিতে পাথর বা পিত্তনালি ব্লক হয়ে আছে কি না—তা পরিষ্কার দেখার জন্য পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়।
- ৫. অন্যান্য উন্নত পরীক্ষা: প্রয়োজনবোধে চিকিৎসক আরও কিছু উন্নত পরীক্ষা যেমন—এমআরসিপি (MRCP), সিটি স্ক্যান (CT Scan), বা এন্ডোস্কোপিক আল্ট্রাসাউন্ড (EUS) করাতে বলতে পারেন।
জন্ডিসের চিকিৎসা (Treatment of Jaundice)
জন্ডিসের কোনো নির্দিষ্ট বা একক ওষুধ নেই। চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পূর্ণ নির্ভর করে জন্ডিসটি ঠিক কী কারণে হয়েছে তার ওপর:
- ভাইরাল হেপাটাইটিসের চিকিৎসা: যদি জন্ডিস হেপাটাইটিস 'এ' বা হেপাটাইটিস 'ই' ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে, তবে সাধারণত কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয় না। এই ক্ষেত্রে মূল চিকিৎসা হলো:
- সম্পূর্ণ শারীরিক বিশ্রাম (Complete Bed Rest): লিভারকে নিজের মতো করে সেরে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের কোনো বিকল্প নেই।
- পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার: শরীরে শক্তির জোগান দিতে শর্করা জাতীয় খাবার ও প্রচুর তরল গ্রহণ করতে হবে।
- হেপাটাইটিস 'বি' বা 'সি' ক্রনিক রূপ ধারণ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ইনজেকশন নিতে হয়।
- অবস্ট্রাকটিভ বা সার্জিক্যাল জন্ডিসের চিকিৎসা: পিত্তথলিতে পাথর বা টিউমারের কারণে পিত্তনালি বন্ধ হয়ে জন্ডিস হলে ওষুধে তা ভালো হয় না। এই ক্ষেত্রে ইআরসিপি (ERCP) বা অস্ত্রোপচার (Surgery) এর মাধ্যমে পিত্তনালির বাধা অপসারণ করা হয়।
- নবজাতকের জন্ডিস (Neonatal Jaundice): নবজাতকদের ক্ষেত্রে বিলিরুবিনের মাত্রা হালকা বেশি থাকলে ভোরের বা সকালের নরম রোদে শিশুকে কিছুক্ষণ রাখা হয়। তবে মাত্রা বেশি হলে হাসপাতালে বিশেষ নীল আলোর নিচে 'ফটোথেরাপি' (Phototherapy) দেওয়া হয়।
জন্ডিস রোগীর ঘরোয়া যত্ন ও খাদ্যাভ্যাস (Diet and Care)
জন্ডিস চলাকালীন রোগীর খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনতে হয়, যাতে লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
কী খাবেন:
- প্রচুর পানি ও তরল: দিনে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ লিটার বিশুদ্ধ ও ফোটানো পানি পান করতে হবে। ডাবের পানি, আখের রস ও লেবুর শরবত খুবই উপকারী।
- সহজপাচ্য শর্করা: চালের ভাত, নরম খিচুড়ি, সাগু, সুজি, চিড়া ও মুড়ি খেতে হবে।
- তাজা ফল ও সবজি: পাকা পেঁপে (লিভারের জন্য দারুণ উপকারী), মিষ্টি কুমড়া, কলা, আপেল এবং তেল-মসলা ছাড়া সেদ্ধ সবজি ও পাতলা ঝোল।
কী খাওয়া নিষেধ:
- সব ধরনের তেল, চর্বি, ঘি, মাখন এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার।
- লাল মাংস (গরু ও খাসির মাংস) এবং অতিরিক্ত প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার।
- বাইরের খোলা খাবার, ফাস্ট ফুড, এবং সোডা বা সফট ড্রিংকস।
- যেকোনো ধরনের অ্যালকোহল বা মদ্যপান।
জন্ডিস সম্পর্কে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার (Myths vs Facts)
আমাদের সমাজে জন্ডিস নিয়ে কিছু অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে, যা রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারে:
- ভুল ধারণা ১: কবিরাজি শেকড়-বাকড় বা তান্ত্রিকের ঝাড়ফুঁক দিয়ে জন্ডিস ভালো করা যায়।
সত্য: এগুলো সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ক্ষতিকর। হাতুড়ে চিকিৎসকদের দেওয়া অজানা ওষুধ লিভারকে আরও দ্রুত সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে। - ভুল ধারণা ২: জন্ডিস হলে একদম ভাত খাওয়া বন্ধ করে শুধু হলুদ রঙের খাবার খেতে হবে।
সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল। রোগীর শক্তি বজায় রাখতে পুষ্টিকর ও শর্করা জাতীয় খাবার (যেমন ভাত, সুজি) খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
জন্ডিস প্রতিরোধের উপায় (Prevention)
সচেতনতাই জন্ডিস থেকে বাঁচার একমাত্র চাবিকাঠি:
- সর্বদা ফোটানো বা বিশুদ্ধ পানি পান করুন এবং বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করুন।
- খাবারের আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পর ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
- হেপাটাইটিস 'বি' এবং হেপাটাইটিস 'এ' এর কার্যকর টিকা নিয়ে সুরক্ষিত থাকুন।
- সিরিঞ্জ, ব্লেড বা টুথব্রাশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন।
উপসংহার: জন্ডিস কোনো ছোটখাটো সমস্যা নয়, আবার সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে এটি নিরাময়যোগ্যও বটে। কুসংস্কার এড়িয়ে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করুন এবং সুস্থ থাকুন।
