![]() |
| আয়কর রিটার্নে জীবনযাত্রার খরচের হিসাব জমা দেওয়ার নতুন নিয়ম ২০২৬ |
প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় করদাতাদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন উঁকি দেয়। তবে এবার আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বেশ কিছু নতুন এবং কড়াকড়ি নিয়ম আরোপ করেছে। আগে অনেকেই কেবল আয় এবং সম্পদের একটি সাধারণ হিসাব দিয়ে রিটার্ন জমা দিয়ে পার পেয়ে যেতেন। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ থাকছে না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, করদাতাদের আয়ের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন খাতের খরচের নিখুঁত হিসাবও জমা দিতে হবে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কেন এই হিসাব দিতে হবে, কোন ফরমে দিতে হবে এবং আয়ের সাথে ব্যয়ের অমিল থাকলে কী ধরনের আইনি জটিলতা হতে পারে।
আয়কর রিটার্নে নতুন নিয়মের মূল কথা
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে এবং কর ফাঁকি রোধ করতে আয়কর বিভাগ প্রতিনিয়ত নতুন নিয়ম চালু করছে। নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় দিকটি হলো—শুধু আয়ের উৎস দেখালেই হবে না, আপনি সেই টাকা কোথায় এবং কীভাবে খরচ করছেন, তারও একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরতে হবে। মূলত একজন করদাতার জীবনমান (Standard of Living) তার ঘোষিত আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করাই আয়কর বিভাগের প্রধান লক্ষ্য।
যাদের বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার বেশি, তাদের জন্য কড়াকড়ি
নতুন আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো করদাতার বার্ষিক আয় যদি ৫ লাখ টাকার বেশি হয়, তবে তাকে আয়কর রিটার্নে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খরচের বিস্তারিত বিবরণ বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হবে। যাদের আয় এর নিচে, তাদের জন্য কিছুটা শিথিলতা থাকলেও, স্বচ্ছতার স্বার্থে সঠিক হিসাব রাখা সবার জন্যই জরুরি।
কোন ফরমের মাধ্যমে খরচের হিসাব দিতে হবে?
আয়কর রিটার্নের সাথে জীবনযাত্রার ব্যয় বিবরণী জমা দেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্দিষ্ট একটি ফরম নির্ধারণ করে দিয়েছে। করদাতাদের 'আইটি ১১গ (২০২৩)' [IT 11Ga (2023)] ফরমে তাদের জীবনযাপন-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় খরচের বিবরণী জমা দিতে হবে। এই ফরমটি পূরণের সময় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, কারণ ভুল তথ্য দিলে পরবর্তীতে কর বিভাগের জেরার মুখে পড়তে হতে পারে।
কোন কোন খরচের বিস্তারিত হিসাব দিতে হবে?
জীবনযাত্রার বিবরণীতে প্রধানত পরিবারের দৈনন্দিন ভরণপোষণ থেকে শুরু করে সারা বছরের বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরতে হয়। চলুন জেনে নিই কোন কোন খাতের হিসাব আপনাকে অবশ্যই দিতে হবে:
১. পারিবারিক ও দৈনন্দিন বাজার খরচ
আপনার সংসার চালানোর জন্য সারা বছর যে খরচ হয়, তার একটি আনুমানিক কিন্তু বাস্তবসম্মত হিসাব দিতে হবে। খাবার, পোশাক এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত।
২. আবাসন ও বাসা ভাড়া
আপনি যদি ভাড়া বাসায় থাকেন, তবে বার্ষিক কত টাকা বাসা ভাড়া দিয়েছেন তার হিসাব দিতে হবে। আর যদি নিজের বাড়ি থাকে, তবে সেই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামত বাবদ সারা বছর কত টাকা খরচ হয়েছে, তা ফরমে উল্লেখ করতে হবে।
৩. যাতায়াত এবং গাড়ির খরচ
আপনার যদি নিজস্ব গাড়ি বা মোটরসাইকেল থাকে, তবে তার পেছনে হওয়া যাবতীয় খরচের হিসাব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে:
- জ্বালানি বা তেলের খরচ
- গাড়ি মেরামতের খরচ
- চালক থাকলে তার বার্ষিক বেতন
- ফিটনেস, রুট পারমিট ও অন্যান্য সরকারি মাশুল
৪. ইউটিলিটি বিল (Utility Bills)
আধুনিক জীবনযাত্রায় পরিষেবামূলক বিল একটি বড় অংশ। আয়কর রিটার্নে আপনাকে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন এবং ইন্টারনেট বিলের সারা বছরের খরচের নিখুঁত হিসাব দিতে হবে।
৫. সন্তানদের পড়াশোনার খরচ
সন্তানদের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি, গৃহশিক্ষকের বেতন এবং কোচিং সংক্রান্ত যাবতীয় শিক্ষা ব্যয়ের তথ্য এতে জানাতে হবে। মনে রাখবেন, পড়াশোনার খরচ যদি আপনার ঘোষিত আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি হয়, তবে অর্থের উৎস নিয়ে আয়কর বিভাগ আপনাকে প্রশ্ন করতে পারে।
পরিবারের অন্য কেউ খরচ বহন করলে কী করবেন?
অনেক সময় এমন হয় যে, আপনি আয়কর দেন ঠিকই, কিন্তু পরিবারের বড় কোনো খরচ (যেমন- বাসা ভাড়া বা সন্তানদের পড়াশোনা) আপনার স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা বা অন্য কোনো সদস্য বহন করেন। এমন পরিস্থিতিতে করদাতাকে 'আইটি ১১গ (২০২৩)' ফরমের মন্তব্য (Comments) কলামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, উক্ত খরচটি পরিবারের অন্য সদস্য বহন করেছেন। প্রমাণস্বরূপ সেই সদস্যের টিআইএন (TIN) নম্বর বা আয়ের উৎস উল্লেখ করা ভালো।
আয়ের সাথে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা থাকলে কী হতে পারে?
অনেকেই কর কমানোর জন্য আয় কম দেখান, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেশি থাকে। আয়কর বিভাগ যখন দেখবে আপনার বাৎসরিক আয় ৫ লাখ টাকা, কিন্তু আপনার সন্তানের টিউশন ফি, গাড়ির তেল খরচ ও বাসা ভাড়া মিলিয়ে খরচ হচ্ছে ৭ লাখ টাকা—তখনই অর্থের উৎস নিয়ে আপনি আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বেন। আয়ের সাথে ব্যয়ের মিল না থাকলে কর বিভাগ আপনার রিটার্ন অডিট করতে পারে এবং অপ্রদর্শিত আয়ের ওপর বিপুল অঙ্কের জরিমানাসহ কর আরোপ করতে পারে।
করদাতাদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- হিসাব সংরক্ষণ করুন: সারা বছরের বড় বড় খরচের রশিদ (Receipt) এবং ইউটিলিটি বিলের কপি যত্ন করে গুছিয়ে রাখুন।
- স্বচ্ছতা বজায় রাখুন: আয় বা খরচ কোনোটিই লুকাবেন না। সঠিক হিসাব দিলে ভবিষ্যতে যেকোনো হয়রানি থেকে বাঁচা যায়।
- পেশাদারের সাহায্য নিন: আয়কর রিটার্ন দাখিল একটি আইনি প্রক্রিয়া। নিজে বুঝতে অসুবিধা হলে একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবী (Tax Lawyer) বা আইটিপি-এর সাহায্য গ্রহণ করুন।
উপসংহার
আয়কর রিটার্নে জীবনযাত্রার খরচের হিসাব দেওয়ার এই নতুন নিয়মটি করদাতাদের জন্য কিছুটা ঝামেলার মনে হলেও, দেশের অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যারা সৎভাবে আয় করেন এবং সঠিক হিসাব রাখেন, তাদের ভয়ের কিছু নেই। সময়মতো সঠিক তথ্য দিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিন এবং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের উন্নয়নে অংশ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আয়কর রিটার্নে খরচের হিসাব দেওয়া কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক?
উত্তর: যাদের বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার বেশি, তাদের জন্য আইটি ১১গ (২০২৩) ফরমে ব্যক্তিগত খরচের বিস্তারিত উল্লেখ করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন ২: আমি যদি খরচের কোনো রশিদ হারিয়ে ফেল, তাহলে কী হবে?
উত্তর: ছোটখাটো দৈনন্দিন খরচের রশিদ সব সময় রাখা সম্ভব হয় না, তাই আনুমানিক একটি যুক্তিসঙ্গত হিসাব দিলেই হয়। তবে ইউটিলিটি বিল, বাসা ভাড়া বা টিউশন ফির মতো বড় খরচের প্রমাণাদি রাখা জরুরি।
প্রশ্ন ৩: স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েই চাকরি করলে খরচের হিসাব কীভাবে দেখাব?
উত্তর: যিনি যে খরচটি নিজে বহন করেন, তিনি তার রিটার্নে সেটি দেখাবেন। অথবা যেকোনো একজন মূল খরচগুলো দেখাতে পারেন এবং অপরজন তার রিটার্নের মন্তব্য কলামে সেটি উল্লেখ করতে পারেন।
