![]() |
| ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্নাতক’ কেন নয়: হাইকোর্টের রুল |
ইউপি চেয়ারম্যানের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্নাতক’ কেন নয়: হাইকোর্টের রুল ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান পদটির গুরুত্ব দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় অত্যন্ত অপরিসীম। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তৃণমূলের বিচারব্যবস্থা বা ‘গ্রাম আদালত’ পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাঁদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যে পদে বসে একজন জনপ্রতিনিধি লাখ টাকার বিচার কাজ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেন, সে পদে নির্বাচনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা নেই ।
সম্প্রতি এই আইনের শূন্যতা ও যৌক্তিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে রুল জারি করেছেন আদালত ।
হাইকোর্টের রুল ও মূল নির্দেশনা
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন ‘স্নাতক’ নির্ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।
একইসঙ্গে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ নম্বর ধারা—যেখানে চেয়ারম্যান প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো উল্লেখ নেই—কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা-ও জানতে চেয়েছে আদালত ।
- বিচারপতিদের বেঞ্চ: বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
- রিটকারী: সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী—অ্যাডভোকেট কাজী ফেরদাউসুল হাসান ও অ্যাডভোকেট মো. তানভীর আহমেদ খান।
- বিবাদীগণ: এলজিআরডি (স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়) সচিব, আইন সচিব এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
রিটকারীদের মূল যুক্তি: ম্যাজিস্ট্রেট বনাম ইউপি চেয়ারম্যান
রিটকারী আইনজীবী কাজী ফেরদাউসুল হাসান আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি বড় আইনি বৈষম্য তুলে ধরেন:
- গ্রাম আদালতের ক্ষমতা: স্থানীয় সরকার আইনের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গ্রাম আদালত পরিচালনার মাধ্যমে বর্তমানে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক বিরোধ বা দেওয়ানি/ফৌজদারি মামলার বিচারকার্য চালাতে পারেন।
- যোগ্যতার বৈষম্য: একই পরিমাণ বা সমমানের আইনি বিচারিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয় একজন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর, যাকে আইন বিষয়ভিত্তিক স্নাতক শেষ করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার অনুপস্থিতি: অথচ গ্রাম আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইউপি চেয়ারম্যানদের জন্য আইনে ন্যূনতম কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
এ কারণে রিটকারীদের যুক্তি, একটি দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ও বিচারিক পদের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ন্যূনতম ‘স্নাতক’ শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা বাঞ্ছনীয় ।
স্থানীয় সরকার গঠনে এ রুলের গুরুত্ব ও প্রভাব
বাংলাদেশের তৃণমূল প্রশাসনিক ও সামাজিক বিচারব্যবস্থায় এ রুলের সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে:
- স্বচ্ছতা ও দক্ষ শাসন: আধুনিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবা প্রদানের জন্য শিক্ষিত জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
- গ্রাম আদালতের সঠিক পরিচালনা: আইনি জ্ঞান ও বিচারিক বোধ না থাকলে সাধারণ নাগরিকরা সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন বিচার ব্যবস্থাকে আরও গ্রহণযোগ্য করবে।
- আইনের শাসন ও সংবিধান: সংবিধানের সমতা ও যোগ্যতার নীতির আলোকে স্থানীয় সরকার আইনের সংশোধন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে বলে বিজ্ঞ অভিজ্ঞ মহলের মত।
উপসংহার
তৃণমূল পর্যায়ে সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন ও দক্ষ সেবা নিশ্চিত করতে আইনের আধুনিকায়ন সময়ের দাবি। হাইকোর্টের এই রুলের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ইউপি আইন ২০০৯-এ সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আসলে তা বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করবে ।
