![]() |
| ঘরে বসেই আয়কর রিটার্ন: ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় বাড়ছে মানুষের আস্থা |
ঘরে বসেই আয়কর রিটার্ন: ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় মানুষের নতুন ভরসা
বদলে গেছে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সনাতনী চিত্র। একসময় কর অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কাগজের স্তূপ সামলানোর যে ভোগান্তি ছিল, তা এখন অতীত। বর্তমানে স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের কয়েক ক্লিকেই ঘরে বসে রিটার্ন দাখিল করা যাচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্রিনে ভেসে উঠছে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র ও কর সনদ।
ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক ও রাজস্ব আদায়ে সাফল্য
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ করবর্ষ থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ডিজিটাল পদক্ষেপের সুফলও মিলছে হাতেনাতে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের রিটার্ন জমা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে এনবিআরের কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।
দেশীয় প্রযুক্তিতেই বাজিমাত
কর প্রশাসনকে ডিজিটাল করার চেষ্টা দেশে নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দিয়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদেশি মডেলগুলো এ দেশের স্থানীয় কর কাঠামো ও ব্যবহারকারীদের চাহিদার সঙ্গে একেবারেই মানানসই ছিল না। তবে এই সমস্যার সমাধান হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তায়। দেশীয় আইটি প্রতিষ্ঠান ‘সিনেসিস আইটি’ সফলভাবে বর্তমান ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করে, যা এখন পুরো অনলাইন রিটার্ন কার্যক্রমকে সাবলীলভাবে পরিচালনা করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অতীতে বিদেশি প্রকল্পে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ হলেও কোনো লাভ হয়নি। দেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করায় এখন যেকোনো ত্রুটি মেরামত বা সিস্টেম আপডেট খুব দ্রুত করা যায়। এছাড়া ডেটা অনলাইনে সুরক্ষিত থাকায় ফাইল হারানো বা জালিয়াতির সুযোগ কমে গিয়ে প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম
- সহজ লগইন: করদাতারা তাদের বৈধ টিআইএন (TIN) এবং নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সহজেই সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারেন।
- ধাপভিত্তিক তথ্য পূরণ: আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়-দেনার বিবরণী অত্যন্ত সহজ ধাপে পূরণ করার সুযোগ রয়েছে।
- সার্ভার সক্ষমতা: কর দেওয়ার শেষ সময়ে অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর চাপ সামলাতেও প্ল্যাটফর্মটিতে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে।
বাড়ছে ব্যবহারকারীর সংখ্যা
পরিসংখ্যান বলছে, ই-রিটার্নের জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়ছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষে যেখানে মাত্র ৫ লাখ ২৭ হাজার মানুষ অনলাইনে রিটার্ন দিয়েছিলেন, ঠিক পরের বছরেই তা লাফিয়ে ১৭ লাখ ১২ হাজারে দাঁড়ায়। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা অভাবনীয় হারে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ইইউর বাংলাদেশ ডেলিগেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কিশোয়ার আমিন জানান, এই সিস্টেম কর ফাঁকি রোধ করার পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াতে ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে কর্পোরেট করদাতাদেরও অনলাইনের আওতায় আনতে তারা কারিগরি সহায়তা দেবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক খালেদ মাহমুদের মতে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তারা দেশের মাটি ও মানুষের বাস্তবতা ভালো বোঝে। ফলে ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।
সিনেসিস আইটির চিফ সলিউশন অফিসার আমিনুল বারি শুভ্র বলেন, জাতীয় পর্যায়ের এমন বড় প্রকল্পে ডেটা সিকিউরিটি ও দেশীয় প্রেক্ষাপট বোঝা ভীষণ জরুরি। ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্মের সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, দেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বড় মাপের সরকারি ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরি ও পরিচালনার সক্ষমতা রাখে।
ভবিষ্যতের রূপরেখা
আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৪৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি সেবা পেতে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখাতে হয়। তাই ই-রিটার্ন এখন কেবল রাজস্ব আদায়ের টুল নয়, বরং নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন, আগামীতে কর্পোরেট রিটার্ন, ডিজিটাল অডিট এবং স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
